মানবপ্রেম আমার রক্তে মিশে আছে : তৃণা মজুমদার

তৃণা মজুমদার

তৃণা মজুমদার। ইঞ্জিনিয়ার, দক্ষ নৃত্যশিল্পী ও সফল নারী সংগঠক। বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সমুন্নত করে তা নতুন প্রজন্মের মাঝে  লালনের মানসে তৈরির মহান কাজে গঠন করেছেন ‘ত্রিশূল’। বর্তমান ব্যস্ততা ও সংস্কৃতি নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন ‘ওমেন বাংলাদেশে’র সঙ্গে। সাক্ষাতকার নিয়েছেন শেখ লিমন

বর্তমান ব্যস্ততা  নিয়ে বলুন?

২০২০ সাল আসলে একটি দমবন্ধকর অবস্থার মধ্যেদিয়ে আমরা সবাই পার করছি। এর থেকে কঠিন মুহুর্ত পুরো পৃথিবীর মানুষ একসাথে আমার মনে হয়না আগে কোনদিন অতিবাহিত করেছেন। প্রতি মুহূর্তই ভয়ে আছি দেশ ও আপনজনদের জন্য, এর মধ্যেই চলতে হবে জীবন ও জীবিকার খাতিরে সবাইকে।

ত্রিশূল-এর যাত্রা কখন, কিভাবে হয়েছিল?

বাংলাদেশের হাজার বছরের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়ার প্রত্যয় নিয়ে, “স্বোপার্যিত কৃষ্টির নীত”-এই স্লোগান কে ধারন করে ২০১৯-এর নভেম্বরে নওগাঁ জেলার, নিয়ামতপুর উপজেলায় যাত্রা শুরু করে “ ত্রিশূল”। বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সমুন্নত করে তা নতুন প্রজন্মের মাঝে যথাযথ ভাবে লালনের মানসে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টীর সাঁওতাল সম্প্রদায় নিয়ে নতুন ভাবে হয় ত্রিশূল” এর আত্মপ্রকাশ।
ত্রিশূল এর সাংস্কৃতিক কর্মীরা প্রথম পারফর্মেন্স করে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাপী নৃত্যশিল্পীদের সংগঠক “The world Dance Alliance-Asia pacific” এর উদ্যোগে Ocean Dance Festival-2019 এ।

বর্তমানে ত্রিশূল এর অবস্থান সম্পর্কে বলুন?

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি রত্রিশ জন সাঁওতাল সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও ”ত্রিশূল”এর বর্তমান সদস্য সংখ্যা পাঁচশত জন ছাড়িয়ে গেছে। এরা সকলেই সাংস্কৃতিক কর্মী। তাদের মধ্যে রয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির সাঁওতাল এবং উড়াও সম্প্রদায়।
সবাইকে একই ছত্র ছায়ার নিচে নিয়ে আসবার প্রধান কারন- কালের বিবর্তনে আমাদের বাংলা সংস্কৃতির যা আমরা হাড়িয়ে ফেলেছি তার যতদুর সম্ভব যেন আমরা ফিরেপাই।
সাংস্কৃতিক কর্মসূচীর পাশাপাশি বিভিন্ন মানবসেবায় নিজেদের নিয়োজিত রাখাও আমাদের ব্রত। করোনা পরিস্থিতির কারনে সাংস্কৃতিক অঙ্গন প্রায় স্থির হয়ে গেছে। যতটুকু চলছে সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে শিল্পীরা সৃজনশীল কাজ গুলো প্রচার করছেন।
আর এই বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে “ত্রিশূল”এর কর্মীরা নৃত্য ও সংগীত চর্চার পাশাপাশি আর্তমানবতার কাজে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে। “ত্রিশূলের” পক্ষ হতে আমরা ৩০,০০০ মাস্ক নিজ হাতে সেলাই করে তা অত্র এলাকার অসহায়দের মধ্যে বন্টন, এছাড়াও খাদ্য সহায়তাও সাবান বিতরনের কাজ আমরা ইতিমধ্যেই সম্পন্ন করেছি।

শুনেছি ত্রিশূল দেশের বাইরেও প্রোগ্রাম করছে, বিদেশে এই দেশের সংস্কৃতির কদর কেমন?

খুব অল্পসময়ের মধ্যেই আমরা ভারত সরকারের আমন্ত্রণে ভারতের ছত্তিস গড়ে National Tribal Dance Festival,Raipur,Chhattisgarh-2019 এ অংশগ্রহণ করি। ভারতের ২৫টি রাজ্যসহ মোট ৬টা দেশের প্রায় ১৪০০ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নৃত্যশিল্পীরা এই উৎসবে অংশ গ্রহণ করেন।
বিদেশে বাংলাদেশের সংস্কৃতির কদর বরাবরই প্রশংসনীয়। আমাদের গুরুজন যারা আছেন তাঁরা সুযোগ পেলেই বহু কাল যাবৎ ধরে আমাদের দেশী সংস্কৃতির প্রচারও প্রসার বিদেশে করে আসছেন। আমি যতবারই বিদেশের কোন উৎসবে অংশগ্রহণ করেছি বিদেশীদের মুখে আমাদের দেশী সংস্কৃতির প্রশংসা সর্বদাই আমায় মুগ্ধ করেছে।

ত্রিশূল নিয়ে আগামীর ভাবনাকি?

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষাও সংস্কৃতি তথা বাংলার সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা এবং তা বিশ্ব দরবারে উপস্থাপনের ক্ষেত্র প্রস্তুতের উদ্দেশ্যে আগামীতে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করাই আমাদের ভাবনা। পাশাপাশি ক্ষুদ্রনৃ-গোষ্ঠীসহ সমাজে পিছিয়ে পড়া এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মানব সম্পদ উন্নয়ন,দারিদ্র বিমোচন ও কল্যাণের লক্ষ্যে তথা আর্থ সামাজিক উন্নয়নে সরকার কর্তৃক গৃহীত বহুমাত্রিক পদক্ষেপের সাথে মিল রেখে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণকরা।

 ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কে নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?

আমাদের গ্রামের (নিয়ামতপুর,নওগাঁ) বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষদের আমি আমার জন্মের পর থেকেই দেখে আসছি। তাদের সাথে আমাদের একাত্বতা সবসময় ছিল এবং আছে। খুব কাছে থেকেই আমি তাদের জীবন-যাপনের পরিবর্তন দেখে আসছি। একসময় শুধু তারা কৃষিকাজ করেই জীবিকা অর্জন করতো।
কিন্তু বর্তমানে সুযোগ পেলেই শিক্ষাগ্রহণ এবং সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রেও নিজেদেরকে উদ্ভুদ্ধ করে থাকে। তারা অনেক প্রতিভাবান এবং পরিশ্রমী। আরও একটি কথা না উল্লেখ করলেই নয় ,সাঁওতালরা প্রকৃতিপ্রেমীএবং তারা উৎসব খুব পছন্দ করে। তারা যে কোনো পরিবেশ কে উৎসব মুখর করে তুলতে পারে। যেমন-বসন্তে “বাহা” , শীতে “সহরাই”, দূর্গাপূজায় দাঁশাই, জ্যৈষ্ঠর ফলমূল উৎপাদনের সময়  “এরোয়” , ফসল ঘরে তোলার সময় “লবান” ইত্যাদি আরও অনেক রকম উৎসবে তারা মেতে উঠে আনন্দে, কিন্তু এই সংস্কৃতি বলতে গেলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু আমাদের একটু সহযোগিতাই পারে তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে।

সংগঠকের পাশাপাশি আপনি একজন নৃত্যশিল্পী, নাচে এলেন কিভাবে?

একদম ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনার পাশাপাশি আমার নৃত্যচর্চা চলে। আমার প্রয়াত মা চাচ্ছিল লেখাপড়ার পাশাপাশি যেন আমি নৃত্য শিখি। আমার পরিবারের সবাই সংস্কৃতিমনা। আমার বড় তিন বোন আমাকে সঙ্গে আমার প্রথম নৃত্য গুরু প্রয়াত আব্দুস সামাদ পলাশের কাছে নিয়ে যায়।

নাচ শিখেছেন কার কাছে?
প্রয়াত গুরু আব্দুস সামাদ পলাশ স্যারের কাছে আমার নৃত্যচর্চা শুরু হয়। গুরু শিবলী মোহাম্মদ স্যারের কাছে কিছুদিন শাস্ত্রীয় কথক নৃত্যের উপর তালিম নিয়েছি। পরবর্তীতে গুরু ওয়ার্দা রিহ্যাবের কাছে আমি শাস্ত্রীয় মনিপুরী নৃত্যে এবং ভারতের গুরু জয়দীপ পালিতের কাছে বর্তমানে আমি “Uday Shankar Dance Style” নৃত্যে তালিম নিচ্ছি।

আপনার প্রিয় নৃত্যশিল্পী কে?

আমার প্রিয় নৃত্যশিল্পী অগণিত। কারো নাম ধরে বলতে চা্ইনা।

 আপনার জন্ম, শৈশর ও পড়াশুনা নিয়ে বলেন?

আমার জন্ম নওগাঁ জেলায়। সেখানেই আমার শৈশব কাটে। আমার স্কুল ছিল “নওগাঁ সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়” এবং “কলেজ হলিক্রস কলেজ,”। আমি “Ahsanullah University of Science and Technology” হতে “Electrical and Electronics Engineering(EEE)” তে BSc শেষ করেছি।

“Summit Communication Limited company” তে আমি প্রায় ৪ বছর ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলাম। যেহেতু বর্তমান যুগ ডিজিটাল যুগ। সরকার Information Technology (IT) ব্যবহার করে পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠীদের জীবনের মান উন্নয়ন করার জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন এবং ইতিমধ্যেই তা বাস্তবায়ন হয়েছে।

আমি প্রকৌশলী হিসেবে আমার সংস্থা ” ত্রিশূল ” এর মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মানব সম্পদ উন্নয়নের লক্ষে Information technology  সম্পর্কে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি।

নাচ নিয়ে আগামী ইচ্ছে কি?

মঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করতে হলে সময় জ্ঞান, পরিমিতবোধ,পরিচ্ছন্ন কোরিওগ্রাফি প্রয়োজন। ত্রিশূলের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর নাচ গুলোকে মঞ্চায়স্থ করতে হলে আমাকে সেই নাচটির মূল বিষয়টিকে মাথায় রেখে এমনভাবে কোরিওগ্রাফি করতে হয় যাতে বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে দর্শক সেইটা আনন্দে উপভোগ করতে পারেন। কারণ আজকাল আমাদের নিজ সংস্কৃতির সাথে ওয়েস্টার্ন এতো মিশে গেছে যে একদম গোড়াতে ফিরে যেতে কেউ আমরা চাইলেও পারছিনা।
আমি চাই সেই শিখড়ে পৌঁছতে যেখানে আমরা ফেলে এসেছি আমাদের স্বোপার্জিত সংস্কৃতি। যা দর্শকের কাছে তুলে ধরলে আরো বেশি উপভোগ করতে পারবে।

রাজপথেও আপনাকে দেখা যায়, রাজনীতি নিয়ে আগামীর ভাবনা কি?

রাজনীতি মানেই আমার কাছে মানবসেবা। আমার বাবা তাঁর সারাজীবন ধরেই এই মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। আর একজন রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান  হিসেবে সেই মানবপ্রেম আমার রক্তেই মিশে আছে। মানুষের পাশে থাকতে আমি ও আমার পরিবারের সবাই ভালোবাসি। তাই মাঝে মাঝেই আমায় রাজপথে দেখা যায়।

একজন নারী হয়ে কাজের সমস্য ও সম্ভাবনার কথা বলেন-

আমি শুধু সম্ভাবনাই দেখার চেষ্টা করি। কারণ সমস্যা যত আছে বা যত আমি দেখতে যাই আমার কাজের গতিকে তা ক্রমশ স্থির করে দেয়।
নারীদের প্রতি দৃষ্টিভংগী অনেকটা আগের থেকে বর্তমানে ভালোর দিকে। তবে কিছু লোক বদলে গেলেও একটি বিরাট অংশই বদলায়নি, কিন্তু তাই বলে নারীরা পিছিয়ে নেই। কর্মক্ষেত্রে নিজেদেরকে আগের থেকে আরো বেশি নিয়োজিত করছেন। অনেকেই E-commerce এর আওতায় ছোট ছোট ব্যবসার উদ্যোগ নিচ্ছেন। নারী উদ্যোগতার হার এখন আগের থেকে নিঃসন্দেহে অনেক বেশি।

ত্রিশূলে নারীদের অংশগ্রহন কেমন? তাদের মাঝে কেমন সম্ভাবনা দেখতে পারছেন?

ত্রিশূলের সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষের তুলনায় বেশি।  এখানকার নারীরা একদম গ্রাম অঞ্চলের হলেও তারা বেশির ভাগই লেখাপড়া করে, শুধু তাই না জীবন ও জীবিকার ত্যাগিদে তারা পুরুষের পাশাপাশি মাঠে গিয়ে ধান লাগানো, ফসলের পরিচর্চা, গবাদি পশুপালন অর্থাৎ বিভিন্ন কৃষিকাজে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে। এইভাবে তারা ছোট থেকেই স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে।

ওমেন বাংলাদেশ/বিএইচ